গত ৫ আগস্টের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর ধানমন্ডির ঐতিহাসিক ৩২ নম্বর বাড়িটি ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের শিকার হয়।
৩২ নম্বর বাড়ির ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
১৯৬১ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পরিবারসহ ধানমন্ডির এই বাড়িতে বসবাস শুরু করেন। এ বাড়ি থেকেই তিনি ছয় দফা আন্দোলন, ১৯৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থান এবং ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট এই বাড়িতেই তিনি সপরিবারে নিহত হন। পরবর্তীতে, বাড়িটিকে জাদুঘরে রূপান্তর করা হয়, যেখানে বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিগত ব্যবহার্য সামগ্রী ও ঐতিহাসিক নথিপত্র সংরক্ষিত ছিল।
অভ্যুত্থান ও বাড়ির ক্ষতি
সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কার নিয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সূত্র ধরে ৫ আগস্ট বাংলাদেশে ঘটে যায় ছাত্র–জনতার অভ্যুত্থান। সেদিন ৩২ নম্বরের এ বাড়িতে আগুন দেওয়া হয়। আগুনে পুড়ে যায় বাড়ির তিনটি তলায় জমানো সব ঐতিহাসিক ও পারিবারিক স্মৃতিচিহ্ন। এখন শুধু বাড়িটির কাঠামোই আছে। তিনতলার ঘরে ময়লার স্তূপে পড়ে আছে ডালাখোলা ভাঙা একটি লাল স্যুটকেস। ধ্বংস হয়ে গেছে বাড়ির তিনটি তলায় জমানো সব ঐতিহাসিক ও পারিবারিক স্মৃতিচিহ্ন।
বুলডোজার দিয়ে ধ্বংসাবশেষ অপসারণ
বাড়িটি পুড়ে যাওয়ার পর, ধ্বংসাবশেষ সরাতে বুলডোজার ব্যবহার করা হচ্ছে। সরেজমিন পরিদর্শনে দেখা গেছে, কিছুই সেখানে অক্ষত নেই। প্রতিটি দরজা-জানালা, আসবাবপত্র এমনকি বঙ্গবন্ধুর স্মৃতিচিহ্ন— কোন কিছুরই অস্তিত্ব নেই সেখানে। লাইব্রেরিতে থাকা কয়েক হাজার বই পুড়ে গেছে। অবশিষ্ট নেই কোনো আসবাবপত্র কিংবা সরঞ্জাম। সেনাবাহিনীর একটি টিমকেও নিরাপত্তা নিশ্চিতের দায়িত্বে নিয়োজিত থাকতে দেখা যায়।
উপদেষ্টা ও অভ্যুত্থান সংশ্লিষ্টদের প্রতিক্রিয়া
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্মৃতি বিজড়িত ৩২ নম্বর বাড়িটি পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় বিভিন্ন মহল থেকে প্রতিক্রিয়া এসেছে। কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বাড়িটি পরিদর্শন করে বলেন, "বঙ্গবন্ধু আর শেখ হাসিনা কোনোভাবে এক কথা নয়। বঙ্গবন্ধু জাতির পিতা, স্বাধীনতার মহানায়ক। আজকে ৩২’র বাড়ি যেভাবে জ্বলতে, পুড়তে ও ধ্বংস হতে দেখলাম। তার আগে আমার মৃত্যু হলে অনেক ভালো হতো।" তিনি আরও বলেন, "আসলে দেশে একটা বিপ্লব ঘটে গেছে। আমি ছাত্রদের এই আন্দোলনকে অভিনন্দন জানাই।" তবে তিনি এও যোগ করেন, "নিশ্চয় আওয়ামী লীগ অন্যায় কাজ করেছে অনেক। কিন্তু শেখ মুজিব কিছু করেনি। তিনি বাঙালি জাতিকে সম্মানিত করেছেন। আজকের এই ধ্বংস, ভবিষ্যৎ ইতিহাসে বাঙালি জাতির জন্য একটা কলঙ্ক হয়ে থাকবে।"
অন্যদিকে, স্বেচ্ছাসেবী ও শিক্ষার্থীরা বাড়িটি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজে অংশ নিচ্ছেন। তারা বলছেন, "আমরা ধ্বংসের পক্ষে নয়, বরং নতুন বাংলাদেশ গড়তে চাই। যারা ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছেন, তাদের সাথে ছাত্র সমাজের বিন্দু পরিমাণ সম্পর্ক নেই। আমরা অত্যন্ত ব্যথিত এমন দৃশ্যের জন্য। এই বাড়িটি স্বাধীনতার স্মৃতি বহন করে। তারচেয়ে বড় বিষয় হলো এই হামলা লুটপাট শুধু দেশের সম্পদ ধ্বংস করা ছাড়া কিছুই নয়।"
উপসংহার
৩২ নম্বরের বাড়িটি বাংলাদেশের ইতিহাসের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বর্তমান পরিস্থিতিতে বাড়িটির ধ্বংসাবশেষ অপসারণ ও পুনর্নির্মাণ নিয়ে বিভিন্ন মহল থেকে মতামত আসছে। এই ঐতিহাসিক স্থাপনাটির ভবিষ্যৎ নির্ধারণে সবার মতামত ও সংবেদনশীলতা বিবেচনা করা প্রয়োজন।
.jpeg)
.jpeg)
.jpeg)
Comments
Post a Comment