হতাশার দিনে ইনিংস পরাজয় এড়ানোর লড়াই বাংলাদেশের
সকাল থেকে মিরপুরে ছিল ঝলমলে রোদ, আর আকাশ ছিল একদম পরিষ্কার। তবে সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে কালো মেঘের আনাগোনা শুরু হয়। আকাশ তখনও ছিল উজ্জ্বল, কিন্তু সেটি যেন হতাশার মেঘ, যা বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের মনে জমতে থাকে। বিকেলে আলোকস্বল্পতার কারণে যখন ১৬.৫ ওভার বাকি থাকতেই দিনের খেলা শেষ হয়ে যায়, স্বাগতিকদের ড্রেসিং রুমও তখন প্রায় অন্ধকারে ডুবে ছিল।
দিনের শুরুতে দুই দল ছিল প্রায় সমানে সমান। কিন্তু দ্বিতীয় দিনেই দক্ষিণ আফ্রিকা এমনভাবে ব্যবধান বাড়িয়ে নেয় যে, এখন ইনিংস পরাজয় এড়ানোই বাংলাদেশের জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে!
মিরপুর টেস্টের দ্বিতীয় দিনে দক্ষিণ আফ্রিকার প্রথম ইনিংস শেষ হয় ৩০৮ রানে। কাইল ভেরেইনার অসাধারণ ১১৪ রানের ইনিংস প্রোটিয়াদের বড় লিড এনে দেওয়ার পেছনে ছিল মূল অবদান।
২০২ রানে পিছিয়ে থেকে দ্বিতীয় ইনিংসে মাত্র চার রানে দুই উইকেট হারায় বাংলাদেশ। সেই ধাক্কা কিছুটা সামলে দিন শেষ করে ৩ উইকেটে ১০১ রানে। তবে নিরাপদ অবস্থানে পৌঁছাতে এখনও অনেক পথ বাকি। ইনিংস পরাজয় এড়াতে প্রয়োজন আরও ১০১ রান।
ম্যাচের প্রথম দিনে ১৬টি উইকেট পড়লেও দ্বিতীয় দিনে মাত্র সাতটি উইকেট পতন হয়। এর পেছনে প্রোটিয়াদের দারুণ ব্যাটিং যেমন ভূমিকা রেখেছে, তেমনি বাংলাদেশের ধারহীন বোলিংও কারণ ছিল। উইকেটও এদিন ছিল ব্যাটিংয়ের জন্য তুলনামূলক সহজ। সব মিলিয়ে নাজমুল হোসেন শান্তর দল এখন পিছিয়ে রয়েছে।
দক্ষিণ আফ্রিকার লিড সীমিত রাখার লক্ষ্য নিয়ে দিনের খেলা শুরু করেছিল বাংলাদেশ। কিন্তু কাইল ভেরেইনা ও ভিয়ান মুল্ডারের ব্যাটিং ক্রমেই সেই আশা ভেঙে দেয়।
আগের দিন শেষ বিকেলে নির্বিঘ্নে কাটিয়ে দেওয়া দুই ব্যাটসম্যান নতুন দিনে দুর্দান্ত ব্যাটিং চালিয়ে লিড বাড়াতে থাকেন। প্রথম ঘণ্টায় ওভারপ্রতি প্রায় চার রান করে ৬১ রান তুলে ফেলেন তারা।
বাংলাদেশের স্পিন আক্রমণের জবাবে তাদের প্রধান অস্ত্র ছিল সুইপ ও রিভার্স সুইপ। মেহেদী হাসান মিরাজ ও নাঈম হাসানের অফ স্পিন একের পর এক সুইপ শট খেলে কার্যত নিষ্ক্রিয় করে দেন তারা। যদিও তাইজুল ইসলামের বিরুদ্ধে সুইপ করার ক্ষেত্রে কিছুটা সতর্ক ছিলেন, তবে সুযোগ পেলে এই বাঁহাতি স্পিনারকেও সুইপে ছাড় দেননি।
মন্থর ও টার্নিং উইকেটে খেলার অভিজ্ঞতা দুজনের কারও ছিল না। তবে তাদের ব্যাটিং দেখে তা বোঝার উপায় ছিল না। বরং দারুণ আত্মবিশ্বাস নিয়ে খেলে স্বচ্ছন্দে রান বাড়িয়ে যান দুজনেই। বাংলাদেশের কোনো বোলারই তাদের বিশেষভাবে অস্বস্তিতে ফেলতে পারেননি।
দলের লিড সহজেই একশ পেরিয়ে যায়, আর সেইসঙ্গে জুটিও পৌঁছে যায় শতরানে।
নাঈমের বলে ৪৭ রানে শর্ট লেগে মুমিনুল হকের হাতে ক্যাচ দিয়ে বেঁচে যান মুল্ডার। কিছুক্ষণ পরেই পঞ্চদশ টেস্টে নিজের প্রথম পঞ্চাশ পূর্ণ করেন তিনি।
দুজনের এই জুটি শেষ পর্যন্ত ভাঙতে সক্ষম হন হাসান মাহমুদ। নতুন স্পেলে ফিরে দ্বিতীয় ওভারেই ৫৪ রান করা মুল্ডারকে স্লিপে ক্যাচ দিতে বাধ্য করেন, যার ফলে ১১৯ রানের দারুণ জুটির সমাপ্তি ঘটে।
পরের বলেই দুর্দান্ত এক ডেলিভারিতে কেশাভ মহারাজের বেলস উড়িয়ে দেন হাসান। মহারাজের টেস্টে পাঁচটি ফিফটি এবং বাংলাদেশের বিপক্ষে ৮৪ রানের ইনিংস থাকলেও, তাকে শুরুতেই ফিরিয়ে দেওয়ার পর দ্রুত ইনিংস গুটিয়ে ফেলার আশা জাগে শান্তদের মনে।
কিন্তু সেখানেই সব পরিকল্পনা ভেস্তে যায়। এবার ভেরেইনার সঙ্গে জুটি গড়ে বাংলাদেশকে হতাশ করেন ডেন পেট। স্পিনারদের সুইপ ও রিভার্স সুইপে ছত্রভঙ্গ করার পাশাপাশি পেস এবং স্পিন উভয়ের বিপক্ষেই দারুণ কিছু ড্রাইভ খেলেন তিনি। পেটের ব্যাটিং ছিল বিশেষজ্ঞ ব্যাটসম্যানের মতোই আত্মবিশ্বাসী।
লাঞ্চের পর ১৩৪ বল খেলে শতরানের মাইলফলক স্পর্শ করেন ভেরেইনা। তার আবেগপূর্ণ ও দীর্ঘ উদযাপন বুঝিয়ে দেয়, এই সেঞ্চুরিটি ২৭ বছর বয়সী এই ব্যাটসম্যানের জন্য কতটা বিশেষ।
চার-পাঁচ জন ফিল্ডার সীমানায় রেখে ভেরেইনার রানের গতি কমিয়ে অন্য প্রান্ত থেকে উইকেট নেওয়ার কৌশল নিয়েছিল বাংলাদেশ। কিন্তু তার রানের স্রোত থামানো যায়নি, আর উইকেটও ধরা দেয়নি। এমনকি দুই ব্যাটসম্যানকে প্রায় এক প্রান্তে পেয়েও রান আউটের সুযোগ হাতছাড়া করে তারা।
সংক্ষিপ্ত স্কোর:
দক্ষিণ আফ্রিকা ১ম ইনিংস: ৮৮.৪ ওভারে ৩০৮ (আগের দিন ১৪০/৬) (ভেরেইনা ১১৪, মুল্ডার ৫৪, মহারাজ ০, পিট ৩২, রাবাদা ২*; হাসান ১৯-২-৬৬-৩, মিরাজ ১৫.৪-০-৬৩-২, তাইজুল ৩৬-৩-১২২-৫, নাঈম ১৮-১-৪৯-০)
বাংলাদেশ ২য় ইনিংস: ২৭.১ ওভারে ১০১/৩ (জয় ৩৮*, সাদমান ১, মুমিনুল ০, শান্ত ২৭, মুশফিক ৩১*; রাবাদা ৭-৩-১০-২, মুল্ডার ৭-১-২৩-০, মহারাজ ৯-০-৩৩-১, পিট ৪.১-০-২৯-০)।


Comments
Post a Comment